হারানো পেশা-৪॥ সোনালী ইসলাম

আমরা তখন কলকাতায় থাকতাম। হেমন্তকালের ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশামাখা দিন জানিয়ে দিতো শীতকাল আসছে। আমাদের ছোটবেলার শীত ছিলো একদম অন্যরকম। কম্বল লেপ জাম্পার সোয়েটার শাল বের হতো তোরঙ্গ থেকে। ন্যাপথলিনের গন্ধ মাখা নানীর হাতের বোনা লাল সোয়েটার গায়ে দিতাম বিছানা থেকে নামার আগেই।
শীতকালের দিন ছোট, তাই দুপুরের দিবানিদ্রা বাদ দিয়ে দুপুরে খাবার পর নানী বারান্দার রোদে চুল শুকাতে বসতেন হাতে উল-কাঁটা নিয়ে, আর সেই একলা দুপুরে সে আসতো।
বারান্দার সিঁড়ির ধাপে বসে নানীকে বলতো, মাইজী, কেমন আছেন? বাড়ির সকলে কেমন আছে? বাপুজী ভাইয়া আপাজান সবাই কুশল মঙ্গল তো?
সে অবশ্য কথাগুলো বলতো উর্দুহিন্দি আর ফার্সি মেশানো ভাষায়, আমি বাংলায় বুঝে নিতাম। নানী কথা বলতেন উর্দুতে।

প্রথমেই পকেট থেকে বের করে আমার হাতে দিতো একমুঠো কিসমিস। আমি অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম তার ধবধবে ফরসা হাতের গোলাপি আঙুল আর ঝকঝকে আকাশ নীল নাকি সমুদ্র সবুজ রহস্যময় চোখের দিকে।
সে তখন খুলে বসেছে তার ঝোলা। ঝোলাটা বেশ মোটা কম্বলের মতো কাপড়ের তৈরি। সেখান থেকে বের করে নানীকে দেখাতো নানা রঙের অপূর্ব নকশার কাশ্মিরী শাল… ছেলেদের জন্য পশমিনা, তাতে সরু নকশা।
এছাড়াও থাকতো আখরোট, কাজুবাদাম, আলুবোখারা আর কিশমিশ।

নানী বলতেন, ইস্ সাল কুছভি নেহি চাহিয়ে।
… কিঁউ জী?
সে প্রায় হাউমাউ করে উঠতো। বলতো, সারাবছর অপেক্ষা করে থাকি তোমাদের জন্য শাল আনব বলে আর তুমিই যদি না নাও তাহলে এই গরীব দুঃখী লোকটা কোথায় যাবে?
… তুমি বিরক্ত করো না তো। প্রত্যেক বছর নতুন শাল কিনতে হবে না কি? গতবছরই তো দিয়ে গেলে লাল শাল।
… আরে, এবছর তো তোমার জন্য খাঁটি ঘী রঙের শাল বুনিয়েছি। কসমছে, তোমার গায়ের রঙের কথা মনে রেখে।
আমার নানীর ফরসা গালে কি একটু লাল ছোপ পড়ল? আমি অবশ্য তখনও লোকটার চোখ নীল না সবুজ সেটা বুঝে দেখছি। নানী হাতের সেলাই রেখে ঘরে গিয়ে পিরিচে দুটো নারকেলের তক্তি আর কাঁচের গ্লাসে এক গ্লাস পানি এনে লোকটার সামনে রাখলেন। মুখে বললেন, নেই জী, ইস সাল কোই ভী খরিদ্দারী নেহি করনা হ্যায়। ইয়ে পানি পি লো যরা।

লোকটা ধীরে সুস্থে তক্তি আর পানি খেতে খেতে গল্প করে তাদের দেশে এবারে জব্বর শীত পড়েছে। বরফ পড়ছে। আংরা জ্বালিয়ে শরীর গরম করতে হচ্ছে মা বহিনদের… খোবানি এ বছর বেশি ফলেনি, আলুবোখারাই হয়েছে বেশি। আপেল সরস হবে। শীত বেশি পড়লে আপেল ভালো হয়। নানী উল বুনছেন আর আনমনে শুনছেন। কিন্তু আমি তো গল্প গিলছি।

এরইমধ্যে, নানাজান এসে পড়লেন অফিস থেকে। মনে হল লোকটা যেন এরই অপেক্ষা করছিলো। নানাজানকে কদমবুছি করে মোসাফাহ করে আদাবসালাম জানালো।
আবার সে বলল সেই একই কথা, নানীর গায়ের রঙ মিলিয়ে শাল এনেছি কিন্তু মাইজী কিছুতেই নিতে রাজি হচ্ছেন না।

নানী বাংলায় বললেন, এমাসে টাকা বাড়ন্ত, খামোখা শাল কেনার দরকার নেই। কিন্তু ততোক্ষণে শাল নানার হাতে তুলে দিয়েছে সে। নানা মৃদু হেসে তার লুকানো তহবিল থেকে কিনে নিলেন শালটা।
একগাল হেসে আরও দুমুঠো কিশমিশ আর আলুবোখারা দিয়ে ঝোলা কাঁধে চলে গেলো লোকটা। আমি নানাকে জিজ্ঞেস করলাম, … নানা, ও কি কাবুলীওয়ালা?
নানা বললেন, না সুনু, ও কাবুলীওয়ালা না, ছেলেটা কাশ্মীরী।

আমি কি তখন জানি যে কাশ্মীর কোথায়… আর সেখানকার সকলের চোখই অমন সাগর সবুজ…

পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কাবুলীওয়ালার’ রহমত আর সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’ আব্দুর রহমান পড়ে মনে পড়তো আমাদের শালওয়ালার কথা। কিন্তু তার নাম জানতাম না।
কলকাতায় গেছিলাম কিছুদিন আগে। বন্ধুরা বলল তারা আর আসে না। ‘শাল বিক্রিওয়ালা’। এখন এম্পোরিয়ামে শাল কিনতে পাওয়া যায়।
কিন্তু, আকাশ সবুজ কিংবা সাগর নীল চোখ আর কই?