হারানো পেশা ৫ ॥ সোনালী ইসলাম



হঠাৎ করেই বোঁওও করে একটা শব্দ শুনতে পেলাম… তারপরই তীব্র জ্বলে উঠলো গাল আর নাকের ডগা। পেয়ারা গাছের থেকে ধুপ করে মাটিতে পড়লাম আমি। বাপরে, কি জ্বালা কি যন্ত্রণা। আমি তো ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে কাঁদতে নানীর ঘরে ছুটলাম। কোঁচড়ের পেয়ারা পড়ে রইল গাছের তলায়।
নানা নানী দুজনেই ছুটে এলেন, ততোক্ষণে আমার নাক ফুলে গোল আর গাল ফুলে বাঁকা হয়ে গেছে। ব্যথায় কান্না থামাতেই পারছি না। ভর দুপুরে পেয়ারা গাছে চড়ার জন্য নানী পাখার ডাঁটি খুঁজতে যাচ্ছিলেন কিন্তু আমার বেঁকে যাওয়া নাক মুখ দেখে নিজেকে সামলে নিয়ে শন্না (চিমটা) নিয়ে এলেন। নাকের আগা আর গালের ফোলা থেকে টেনে বের করলেন মৌমাছির হুল। তারপর সেখানে চুন লাগিয়ে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ নাক্সভমিকা দুই বড়ি খাইয়ে বিছানায় শুইয়ে রাখা হলো। সন্ধ্যা নাগাদ হালকা জ্বর এসে গেলো।
নানী আমার গায়ে কাঁথা চাপিয়ে গজর গজর করতে লাগলেন, আমি একটা ধাড়ি মেয়ে হয়ে এখনো কেন সহবৎ শিখলাম না, কেন গাছে চড়ে বেড়াই, ইত্যাদি ইত্যাদি। নানা নামাজ পড়ে এসে দোয়া পড়ে ফুঁ দিলেন কিন্তু ফোলা আর ব্যথা বাড়তেই লাগল। নানী বললেন, পিছনের বাগানডা জঙ্গল হয়ে গেইছে। কালকে মউয়াল গো খবর দে’ আনবেন, মৌচাক আর বোল্লার চাক ভাঙ্গতি হবে।
নানা পড়লেন আতান্তরে, কালকের মধ্যে মউয়াল কই পাওয়া যাবে। ততোক্ষণে নানীর ভাই চুন্নুনানার সাইকেলের বেল শোনা গেল। বিকালবেলা প্রায়ই উনি বেড়াতে আসতেন সঙ্গে আনতেন তেলেভাজা, পিয়াজু, জিলিপি। এই নানা ছিলেন খুব মজার মানুষ। উনি সব শুনে বললেন, কালই মউয়াল নিয়ে আসবানে। মউয়ালের কি অভাব পড়িছে নাকি? ডাকলিই লাফাতি লাফাতি আসবেনে সব।
পরদিন সকাল দশটার দিকে দুজন লোক এলো। একজন বয়স্ক আর অন্যজন অল্পবয়সী। কাঁধে ঝোলা। নানীকে বলল, ও চাচী, এক খুরো কেরোসিন আর কোস্টা লাগবেনে যে। আর একখান পরিষ্কার বালতি।
নানী কেরোসিনের জেরিক্যান থেকে বাটিতে কেরোসিন আর কাঠ রাখার কোনা থেকে পাটের আঁশ একগোছা এনে দিলেন। যশোরের মানুষ পাটের আঁশকে কোস্টা বলে। বয়স্ক মানুষটা একটা বাঁশের আগায় কোস্টা বেঁধে কেরোসিনে ভিজিয়ে নিলো। তারপর আমাদের সব্বাইকে ঘরে ঢুকে যেতে বলল। নিজেরা মাথায় পরে নিলো মোটা কাপড়ের চোখ মুখ ঢাকা টুপি।
তারপর বাঁশের আগায় আগুন লাগিয়ে উঠে গেলো পেয়ারা গাছে। তার পাশেই বড় ঝোপালো আম গাছ আর ওই পাশে চালতা গাছ।
আমি মা নানী নানা সবাই ঘরে দরজা জানালা বন্ধ করে বসে আছি আর শুনতে পাচ্ছি মৌমাছির ভনভন শব্দ।

আধা ঘন্টা পরে লোকগুলো ডাক দিলো। আমরা ভয়ে ভয়ে বারান্দায় এলাম। বালতিতে ইয়াবড় এক মৌচাক। কয়েকটা মৌমাছি তখনো ঘুরছে এপাশে ওপাশে।
লোকটা বলল, কালকে মামনি বড় বাচান বেইচে গেছে। আপনাগো পিয়ারা গাছে বোল্লার বাসা হইছিলো আর চালতা গাছে ভিমরুলির চাক। ভিমরুলির ঘা খালি হাসপাতালে নিয়া গালতো কিন্তু কলাম।
মৌচাকের অর্ধেক কেটে চিপে গাঢ় সোনালী রঙের মধু বের হলো অনেকখানি। নানী হরলিক্সের বয়ামে তুলে রাখলেন। লোকগুলোকে নানা পাঁচ টাকা আর বাকি মৌচাক দিয়ে দিলেন। ওরা মধু নাকি বিক্রি করবে। ওরা বলল, বাড়ির পিছনের জঙ্গল কাটি দেন ভাইসাব, মৌমাছি ভিমরুল আবার আসবেনে। তাছাড়া সাপ ব্যাঙ তো আছেই।
সন্ধ্যায় নানী নাস্তা দিলেন গরম আটার রুটিতে মধু মাখিয়ে।
ততোক্ষণে আমার নাকমুখের ফোলা কমে গেছে।
মউয়ালরা এখনো হয়তো আছে। কিন্তু তারা সুন্দরবনে যায় মধু আনতে। কেউ কেউ সরষে ক্ষেতে মৌমাছি পালন করেন বাক্সে ভরে।
সেই কাশীর পেয়ারা, চালতা আর ঝোপালো আমগাছ আর নেই যে।
মৌমাছি ইটকাঠের দেয়ালে আসেনা আর।