হারানো পেশা- ৬ ॥ সোনালী ইসলাম

কার্তিক মাসের শুরুতেই সেকালে হিম পড়তো। সন্ধ্যায় কুয়াশাজড়ানো গাছপালা আর ভোরে শিশিরে ভেজা ঘাসের শীষ আর ভিজে শিউলি ফুল। আমার তখন নির্ঘাৎ সর্দি লাগবে আর নানী প্রতি সকালে তুলসীপাতার রস আর মধু খাওয়াবেন, আর সন্ধ্যা বেলায় আদা দারচিনি দেয়া মশলা চা।

হিম পড়লেই এসে হাজির হত সামাদ। নানী তাকে বলতেন,
-অ সামাইদ্যা, আইছিস বাপ, তালি লাগি পড়।
-লাগি তো পড়বানে চাচী, দু’এক টাকা এভান্স দেবেন না?
-এই অনামুখো, এভান্স কি রে?
-ওই যে কাজকামের আগে মানষি দেয়।
-এডভান্স। তুই কবের থে লাটসাহেব হলি রে সামাইদ্যা যে তোরে এডভান্স দে’ গাছ কাটাতি হবে? বিয়াদপ কোহানকার।
-চাচী, রাগেন ক্যান? আপনাগো গাছ কাটতিছি দাদার আমল থে, আমার বাপেও কাটিছে, কিন্তু সব কিছু এতো আক্কারা যে মাটির ঠিলে কলস, দা, কাটারি, এ বচ্ছর কেউ আগাম দেচ্ছে না। তাই তো বিয়াদবিটা কত্তি হচ্ছে।

নানী গজগজ করতে করতে ঘরের থেকে পাঁচ টাকা এনে হাতে দিয়ে বললেন, এক কাটের রস কিন্তু এবারে পাবিনে। আমার এ বছর গুড় বানানো লাগবেনে।
-এক আধ কলসি দিয়েন চাচী। আপনারা না দিলি যাই কই?
-কবে আসবি?
-কালকে এইসে আগে গাছ গুনো ঝুড়ে নি।
পরদিন কাঁথার তলা থেকে শুনতে পাচ্ছি বাগানে ঝুপ ঝুপ শব্দ। আর কি শুয়ে থাকা যায়, আমি একছুটে বাগানে।
সামাদ আমাকে দেখে একটু হেসে বলল, -এটুস খানি দূরে সইরে দাঁড়াও মাগো, খেজুরির কাঁটা ফুটতি পারে।

সারা বাগানের গাছ ঝুড়ে দেওয়া হলো। মানে, সারাবছর এর জমে থাকা শুকনো পাতা আর কিছু কাঁচা পাতা কেটে ফেলে সেগুলো বাগানের এককোনে এইই উঁচু ঢিপ করে রাখা হলো। নানীর দেয়া গুড় মুড়ি খেয়ে বেলাবেলি সামাদ চলে গেল। ঝামর চুলো ঝুপসি খেজুর গাছগুলো এখন বেশ চুল দাঁড়ি কাটা ভদ্রলোক এর মতোন দাঁড়িয়ে রইল। আমার কিন্তু মন খারাপ হয়ে গেল। বাগানটা কেমন পরিষ্কার ফাঁকা ফাঁকা লাগছিলো।
দুদিন পরে সামাদ এলো দশ বারোটা ঠিলে নিয়ে। খেজুর পাতার আগুন জ্বালিয়ে সেগুলোর ভেতর পুড়িয়ে নেয়া হলো। তারপর সামাদ তার তীক্ষ্ণ ধারালো হা দিয়ে গেজুর গাছের গায়ের একপাশ ছিলে ফেলল। সাদা ধবধবে চৌকনো অংশে নালি কেটে বাঁশের কঞ্চি গেঁথে দিলো। কঞ্চির মুখে বাঁধা হলো সদ্য পরিষ্কার করা পুড়ানো ঠিলে বা ছোট কলসি। টপ টপ করে রস পড়তে লাগলো তারমধ্যে। মাগরিবের নামাজের আগেই আবার এলো সামাদ টপাটপ গাছে উঠে ঠিলেতে সঞ্চিত রস ঢেলে নিলো কলসিতে। ভরা কলসি এনে রাখল নানীর সামনে।

নানী পাতলা কাপড়ে ছেঁকে নিলেন সেই রস। ধামিতে মচমচে মুড়ি আর কাঁসার গেলাসে করে নতুন টাটকা রস সবাইকে খেতে দেয়া হলো। সামাদও উঠোনে বসে রস মুড়ি খেয়ে নিলো। নানী তখন মাগরিবের নামাজের জন্য তৈরি।

পুরো শীতকাল সামাদ এলো প্রতিদিন। এককাটের রস নানীকে দিতো। দোকাটের রস সে নিয়ে যেতো। তিন দিন পরপর গাছের জিরেন। সেদিন ঠিলে বাঁধা হত না। কিন্তু ফোঁটা ফোঁটা রস পড়ত মাটিতে। নানী মালসা পেতে সেই রস সংগ্রহ করে বানাতেন সিরকা।

উঠোনের বড় চুলায় খেজুর পাতার আগুনে রস জ্বাল দিয়ে নানী তৈরি করতেন গুড়। পাটালিগুড়, ঝোলাগুড়, নলেনগুড়। কতো নাম তাদের, সারাবছর সেই গুড় দিয়ে রান্না হতো পায়েস অথবা ঘন দুধের সাথে রাতের দুধভাত। স্বপ্নের মতো স্বাদ সেই দুধভাতের।
এর মাঝে পিঠে পুলি সিমুই তৈরি চলতো, শীতকালে বেড়াতে আসতেন শহর বা গ্রামের অতিথীরা। নারকেলের নাড়ু, মোয়া বানিয়ে টিন ভরে রাখতেন নানী। যতই রাগ দেখান না কেন, ‘সামাইদ্যা’ র জন্য অবশ্যই তুলে রাখতেন পিঠে অথবা মোয়া। ভাগ করে খাওয়ারই রেওয়াজ ছিলো তখন।

শীত ফুরিয়ে এলো। খেজুরের রস টক হয়ে যেতে লাগল। সামাদ এরপরও দিন সাতেক সেই টক হয়ে যাওয়া রস নিয়ে যেতে লাগলো। নানী গজগজ করলেন। শুনলাম সেটা দিয়ে নাকি সামাদ তাড়ি বানায়। “তাড়ি কি”? জিজ্ঞেস করে নানীর কাছে ধমক খেলাম।

শেষ দিন সামাদ এসে পাওনা টাকা বুঝে নিলো। দেখলাম নানীর খেরো খাতায় লেখা আছে কয়টা গাছ কয়দিন কেটেছে আর কয় কলস রস দিয়েছে। হিসেব করে নানী টাকা দিয়ে দিলেন।

সামাদ বলল, চাচী, সামনের বছর আমার ছোট ভাই আসাদ আসপেনে গাছ কাটতি।
-ক্যান তুই কনে যাবি?
-খুলনার জুট মিলে কাজ পাব চাচী সিডাই করব। গাছির কাজে আর পুষায় না।
সেই তো, গাছির কাজে পোষাবে কি করে?

খেজুর গাছই আর কই?
সামাইদ্যা গাছি হারিয়ে গেছে।