হারানো পেশা-৭ ॥ সোনালী ইসলাম


-ধুরো এই হাড়িটারও কানা খুলে গেল। ফুটো হইছে আরও দুখোন, রান্নাবাড়া বাদ দিতি হবে দেখতিছি।

নানীর মেজাজ বেশ খারাপ। আমি নামতা মুখস্ত করতে করতে একবার চোরা চোখে তাকিয়ে নিলাম। সতের এর ঘরের নামতাটা বড়ই গড়বড়ে, কিছুতেই মনে থাকতে চায়না। নানীর মেজাজ খারাপ মানে নামতা মুখস্ত না হলে কপালে পাখার ডাঁটি নাচছে। আমি গলা তুলে পড়তে লাগলাম,
সতেরো এক্কে সতেরো
সতেরো দুগুণে চৌতিরিশ…

খিড়কির দরজা খুলে বাসায় ঢুকলেন আমাদের মুশকিল আসান চুন্নু নানা, নানীর ছোট ভাই।

… ও বু, চা লাগাও দিনি এককাপ, কিরে সুনু সতেরোর নামতা গিলতিছিস? কুড়ির থে তিন বিয়োগ দিলিই তো হয়, এতো ফইজৎ করার দরকারডা কি?

নানী ঝামরে উঠলেন,
-এই এলেন একজন কুবুদ্ধি দিতি, ক্যান ও পড়তিছে পড়তি দে, আর তুই চট করে যা তো, বড় বাজার থে হাড়িপাতিল সারাইওলারে ডেইকে আন। আমি তোর চা বসাচ্ছি।

-বু মশলা চা দিবা কিন্তু।
– দিবানে, তুই গেলি!

চুন্নু নানা সাইকেল ঠেলে আবার বেরিয়ে গেলেন, ফিরে এলেন আধা ঘন্টা পরে সাইকেলের পেছনে ঝোলা হাতে এক শুকনো চিমড়ে মার্কা লোককে বসিয়ে। নানীর মেজাজকে চুন্নু নানাও সমঝে চলতেন কিনা!

নানী এরই মধ্যে দুটো ফুটো হয়ে যাওয়া আর একটা কান্ধা ভেঙে যাওয়া হাড়ি, আংটা খুলে যাওয়া কড়াই আর দুটো ফুটো বালতি এনে উঠোনের কোণে ঢিপ করে রেখেছেন।

নানী প্রথমেই এক গেলাস পানি দুটো মোয়া আর এলুমিনিয়াম এর কলাই করা কাপে চা দিলেন লোকটাকে। চুন্নু নানা আমার মাথায় একটা আদরের চাটি মেরে বারান্দার মাদুরে গুছিয়ে বসলেন চায়ের কাপ হাতে নিয়ে। লোকটা সুড়ুৎ সুড়ুৎ শব্দ করে চা খেয়ে মোয়া দুটো ঝোলায় ভরে নিলো। পরে খাবে বোধহয়। নানী আমাকে বললেন,

-হেঁশেলের থে কুপিটা ধরায় এনে দে দিনি, এখন আর সতেরো সতেরো করে চেঁচাতে হবে না। মন তো পড়ে থাকপে হাড়ি পাতিলির মধ্যি।

আমিও লক্ষী মেয়ের মত কুপি জ্বালিয়ে নিয়ে এসে টুল পেতে বসে গেলাম সারাইওলার সামনে।

একদলা এলুমিনিয়াম, একটা চিমটে আর ছোট একটা হাতুড়ি বের করে লোকটা কাজে লেগে গেলো।

একটু করে এলুমিনিয়াম এর টুকরো নিয়ে চিমটে দিয়ে গরম করতে লাগলো কুপির আগুনে তারপর সেটা ঠুকে ঠুকে বসালো হাড়ির ফুটোর মধ্যে। কি ছোট্ট ফুটো কিন্তু কি নিখুঁত দক্ষতায় কাজ করছিলো সে। কি অসীম মনোযোগ এর সাথে।

ঠুকে ঠুকে ট্যাপ খাওয়া হাড়িগুলো সমানও করে দিলো সে। একই ভাবে ঠিক করল বালতি দুটো। কান্ধা ভেঙে যাওয়া হাড়িটার পুরনো কান্ধা কেটে ফেলে এলুমিনিয়াম এর পাত দিয়ে নতুন কানা লাগালো।

চুন্নু নানা ততোক্ষণে নানীর সাথে গল্প কর‍তে করতে আরও এককাপ চা খেয়ে নিয়েছেন।

কাজ শেষ করে লোকটা ফুটো হাড়ি বালতির মধ্যে পানি ভরে নানীকে দেখালো যে আর পানি পড়ে যাচ্ছে না। নানী খুঁটিয়ে দেখে বেশ সন্তুষ্ট হলেন। তারপর দরদাম শুরু করলেন। চুন্নু নানা ধমক আর লোকটা নানীর মুখ ঝামটি খেলো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার দাবি মোতাবেক পাঁচ টাকা দেয়া হলো। নানী ঘর থেকে আরও চার‍টে মোয়া এনে লোকটাকে দিলেন। বললেন,

-পোলাপান রে দিও, কইও ‘ফুপু দেছেন’!
মোয়া ঝোলায় ঢুকিয়ে রাখাটা নানীও খেয়াল করেছেন তাহলে!

চুন্নু নানা সাদা মুখে জিজ্ঞেস করলেন,
-ও বু, দুখোন নতুন পাতিল কিনে নিলিই তো পারতে, এতো আবার ফুটো হবেনে।

-পারলিই কিনতি হবে। সংসারে অলক্ষীর বাস বানাবো নাকি।
– না মানে, পুরনো হইলো তো হাড়িগুলোন।
– পুরনো হলিই সংসার থে বিদেয় করতি হবে? ওরে অনামুখো, তোর দুলাভাই তো এই সংসারে সব চাইতে পুরনো, তা লি তারে দিই ফালায়ে।

নানা ইজিচেয়ারে বসে ছিলেন। বললেন,
– চুন্নু তোমার বু’ রে আর চেতায়ে না, তোমারেই মেরামতওয়ালা এনে আমারে ঠুকতি হবেনে।

আমার খুব মনে ধরলো কথাটা। পুরনো হলেই ফেলে দেয়া যায় না। জড় বস্তুও লক্ষ্মী হাতের পরশে জীবন্ত হয়ে ওঠে। অকারণ অপচয় না করেও সংসার চালানো যায়।

কিন্তু চাইলেই আর হাড়িপাতিল সারাইওয়ালা খুঁজে পাইনা। ননস্টিক প্যান আর ওভেন প্রুফ ক্যাসারোলের জগতে ওদের ঠাঁই নেই।

আমাকে কিন্তু সেইদিনই সতেরো ঘরের নামতা মুখস্ত বলতে হয়েছিলো। হাঁড়িপাতিল বালতির ঝামেলায় থাকলেও আমার পড়ার ব্যাপারটা নানীর ভুল হতো না।
আর কুড়ি থেকে তিন বিয়োগ দিলে সতেরো হয় বটে কিন্তু চল্লিশ থেকে তিন বিয়োগ দিয়ে চৌত্রিশ না হয়ে সাঁইত্রিশ হয়ে যায়।
তক্ষুনি পিঠে পাখার ডাঁটি।