হারানো পেশা- ৮ ॥ সোনালী ইসলাম


ভাদ্রমাস চলে গিয়ে আশ্বিন মাস এসে গেছে। কালোকালো মোষের মতো পানি ভরা মেঘগুলো সরে গিয়ে আকাশ এখন নীল সাদায় লুকোচুরি খেলছে। সোনারঙ রোদ্দুরে ভরে আছে উঠোন।

নানীর কাজের শেষ নেই, কাঠের বাক্স খুলে বের করছেন লেপ, কম্বল, লেপের ওয়াড়। রোদ খাইয়ে তাদের ভ্যাপসা গন্ধ ছাড়াতে হবে।

এই সময়ে শোনা যেত,
– লেপ সিলাবেন… তুশোক সিলাবেন… বালিশ…

নানী বলতেন, সুনু, ডাক দে তো ধুনুরি কে, তোর নানার লেপটা পাতলা হয়ে গেছে, দেখি দরদামে হয় কি না।

আমি আবার ডাকতে পারব না এও কি হয়? একছুটে বাইরের বারান্দায় গিয়ে ডেকে আনলাম ধুনুরি কে। তারা দুজনে আসত একসাথে, একজনের হাতে ধনুকের মতন একটা যন্ত্র আর লম্বা একটা চিকন বাঁশের লাঠির ছপটি আর অন্যজনের কাঁধে বিশাল বস্তা।

উঠোনে সবচাইতে বড় খেজুর পাতার পাটি বিছিয়ে দেয়া হলো। নানী পুরনো লেপ দুটো তার উপরে এনে রাখলেন।

-কি কি করতি হবে চাচি?
শুধালো লোকটা।

-শোন, এই দুটো লেপ দিয়ে একখানা লেপ বানাবা, তুলো কিন্তুক ঠিক মতন পিঁজে নিবা, গাঁট থাকলি আবার খুলাবানে। আর নতুন কি কাপড় আনিছ দেখাও দিনি, আর একটা নতুন লেপ করতি হবে, লেপের খোলও বানাবা।

-বালিশ বানাবেন না?
-শিমুল তুলা আনিছ!
-তা আছে!
-আমারে দেখায়ে নিবা, লেপে দিবা কাপাস তুলা। ভুল হয়না যেন।
-চাচি সিলাবার আগে ডাক দিবানে, দেইখে যাবেননে। না দেখাই কি আমি কিছু করব।

নানী গাটরি থেকে বের করে দেয়া লালসালু কাপড় হাত বুলিয়ে দেখলেন। এর মধ্যে একটা পছন্দ করলেন। ততোক্ষণে সঙ্গের লোকটা পুরনো লেপের সেলাই খুলতে শুরু করে দিয়েছে। পুরনো তুলো পাটির উপর ডাঁই করে রেখে শুরু হলো তুলো ধুনা। ‘তুলোধুনো’ করা কাকে বলে সেটাই দেখলাম ধনুকের মতো যন্ত্রটার টান করে বাধা দড়িতে টংকার তুলে তুলোকে জমাট বাঁধা অবস্থা থেকে নরম করা হলো।

নতুন কাপড়ে পুরোনো পেঁজা তুলো ভরে ছপটি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে সমান করে সেলাই শুরু করল দুজনে। তৈরি হলো নতুন লেপ।

এরপর নানী বসলেন তুলো বাছাই করতে। কার্পাস তুলো লাগবে লেপ বানাতে আর শিমুল তুলোয় তৈরি হবে বালিশ। নতুন তুলো লেপের জন্য কয় সের লাগবে আর বালিশে কয় সের তাও বলে দিলেন নানী। এই সাথে সেলাই করতে হবে লেপের জন্য ওয়াড়, সেটা বানানো হবে মার্কিন কাপড়ে।

সব মিলিয়ে বিরাট কর্মযজ্ঞ। দুপুরে দুজনে পেট ভরে ভাত খেয়ে লেগে গেলো সেলাই করতে লম্বা বড় সুঁচ আর বেশ মোটা সুতো দিয়ে পদ্ম ডিজাইন করে সেলাই হলো লেপ। কি দ্রুত হাত চলে দুজনের। দুপাশে দুজন বসে খুব তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেলল লেপ আর লেপের ওয়াড়। নানী অবশ্য মাঝেমাঝেই এসে তদারকি করে গেছেন।

নতুন লেপ দুটো আর বালিশ দুটো সাজিয়ে রাখা হলো নানার বিছানায়। তুলো আর নতুন কাপড়ের গন্ধ মাখা নরম লেপগুলো কি যে আদুরে ওম দিতো তা বলার না।

বিভিন্ন দেশ ঘুরে ঢাকায় এসে বুড়ো বয়সে সংসার পাতলাম। শীতের আগে মনে পড়ল ছোটবেলার লেপের কথা। এতোদিনতো ব্ল্যানকেট গায়ে দিয়ে চলেছি। ড্রাইভার কে বললাম লেপ সেলাইওয়ালা ডেকে আনতে। তো, সে ব্যাটা জিন্সের প্যান্ট পরা এক চ্যাংড়া ছোঁড়াকে ধরে আনল যার আবার চুলে খানিকটা মরচে রঙ করা।

তার হাতে ছোট্ট ছোট্ট প্যাকেটে তিন টুকরো তুলো আর ল্যামিনেশন করা বইয়ের মধ্যে কাপড়ের স্যাম্পল। সে বলল, আমি পছন্দ করে দিলে কারখানা থেকে লেপ বানিয়ে আনবে, আর মার্কিন কাপড় কাকে বলে সে বুঝতে পারল না।

আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, – তুলো ধুনবে না? ধুনকার কই!
সে আরও অবাক হয়ে বলল, – ম্যাম, আমাদের তুলো তো মেশিনে ম্যাশ করা হয়।

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,
– আচ্ছা, পরে বানাব।
সে বলল, -ওকে, আমার কার্ডটা রাখেন, ফোন করবেন।

ড্রাইভার পরে বলল, -খালাম্মা আজকাল গেরামেও মানুষ কম্বল গায়ে দেয় আমার ভাই দুবাই থেকে আব্বা মা কে আনি দেছে।

বুঝলাম এই বয়সে নতুন তুলো আর লেপের ঘ্রাণ স্মৃতি হয়ে গেছে।