হারানো পেশা- ৯ ॥ সোনালী ইসলাম



দুপুরে আমার কক্ষনও ঘুম আসতো না কিন্তু নানীর পাশে চোখ বুঁজে শুয়ে থাকতে হতো। নানীর নাক ডাকা ছাপিয়ে ভেসে এলো ডুগডুগির শব্দ। আমি নিঃশব্দে উঠে বসলাম। ইসস্… কতোদিন পরে এসেছে। কিন্তু নানী যে ঘুম, আমি কি করি…

-বালিশির তলায় একখান সিকি আছে নে যাও। নিজিউ ঘুমুবে না আমারেও ঘুমুতি দেবে না। ফাজিল কোহানকার।

ওমা! নানী জেগে গেছেন। আমি তার বালিশের তলায় হাত ঢুকিয়ে সিকিটা নিয়ে এক ছুট্টে চলে গেছি সদর দরজার বাইরে।

ডুগ ডুগ শব্দ করতে করতে লোকটা এলো, হাতে দড়িতে বাঁধা দুটো বানর। আমি হতাশ হয়ে গেলাম। ভালুক নেই কেন? আজকে লোকটা ভালুক আনেনি শুধু দুটো বানর। কালো লোমওয়ালা ছোট ভালুকটা আমার খুব প্রিয় ছিলো। কি সুন্দর দু’হাত তুলে মানুষের মতো সালাম দিতো।

আমাকে দেখে লোকটা জিজ্ঞেস করল,
-খুকি খেলা দ্যাকবা?

আমি মাথা নাড়লাম, ততোক্ষণে আশপাশের বাড়ির ছোট বাচ্চারা জমা হয়ে গেছে। তবে আমি পয়সাটা দেব বলে লোকটা আমার সামনে বানর দুটো নিয়ে বসল।
ডুগডুগি বাজিয়ে সুর করে বলতে লাগল,
– কমল কুমার কমলা সুন্দরী তোমরা খুকিকে সালাম দাও।

বানর দুটো দুইহাত কপালে তুলে সালাম দিলো। তারপর শুরু হল খেলা দেখানো।

নতুন জামাই কেমন করে শ্বশুর বাড়ি যায়।
বউ এর হাত ধরে বর কেমন করে নিয়ে আসে।
মার খেয়ে বউ কেমন করে কান্নাকাটি করে।
সাগর পেরিয়ে লাফ দিয়ে হনুমান কেমন করে লঙ্কায় গেছিল।

এগুলো সব একে একে দেখালো কমল কুমার আর কমলা সুন্দরী। তারপর হাতপেতে দাঁড়াল আমারই সামনে। আমি সিকিটা কমল কুমারের হাতে দিলাম। সে কপাল চাপড়ে কানতে লাগল।
লোকটা বলল,
-এতো গুনো খেলা দেখায়ে একখান সিকি তি কি কমল কুমারের ইজ্জত থাকে কও খুকি?

জড়ো হওয়া বাচ্চাকাচ্চাগুলো এ ওকে খোঁচা দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। আমি পড়ে গেলাম ভারি আতান্তরে। এখন আবার কমলা সুন্দরীও গড়াগড়ি করে কানতে লেগেছে। আমার পিছন থেকে ঝামটি দিয়ে উঠলো করিমন, আমাদের বাড়ির কাজের লোক।
-ইহ্হি রে… দুখোন বানরের একটুস খানি নাচানাচি দেখায়ে কি আস্ত টাকা চাও নাকি? ভালুক আনলি তাও বোঝতাম।

লোকটা হাতজোড় করে বলল,
– ভালুকটা মরি গেছে গো মা, কি যে একখান অসুখ হইলো সারাগায়ে ঘা হইয়ে মরি গেল, আমারেও মারি গেল।

– আর এক খানা কিনলেই তো পার।
– মা গো ভালুক কিনার পয়সা পাব কনে? এতো পয়সা থাকলি কি এই বান্দরগো তোমাগো দুয়োরে আসি? পেটের জ্বালায় আসি গো মা। আমি তো একা খালি হবেনানে, এই দুডো অবলারেও তো খাতি দিতি হয় ।

মনে হয় করিমনের মনটাও খারাপ হয়ে গেলো, সে বলল-
– একটু রও বাপু আসতিছি।

লোকটা হাতপা গুটিয়ে বসে রইল।

করিমন চারটে কলা আর এক ধামি মুড়িতে গুড় নারকেল কোরা মিশিয়ে এনে লোকটাকে দিলো।

কি যে খুশী হলো লোকটা, তার শুকনো মুখে যেনো আলো জ্বলে উঠলো। হয়তো সারাদিন খায়নি কিছুই।

বানর দুটো প্রথমে কলাগুলো খেলো। তারপর লোকটার পাশে গিয়ে বসল। লোকটা লোকমা তুলে কমল আর কমলাকে নারকেল গুড় মাখা মুড়িও খাওয়ালো খানিক। তারপর করিমনের দেয়া ঘটির পানি নিজে খেয়ে ওদের খাইয়ে দিলো।

যাবার সময় সালামটা দিলো কিন্তু করিমনকে।

করিমন মুখ ঝামটা দিয়ে বলল,
– ঈহ, ঢং কতো।

করিমন কিন্তু খুশী হয়েছিলো। তাইতো বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকলো যতক্ষণ শোনা গেলো

ডুগ ডুগ ডুগ ডুগ ডুগ ডুগ…